জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সচিবালয়ে এক ধরনের অপেক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা দায়িত্বের শেষ প্রান্তে এসে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন। দায়িত্ব পালনের সময় হওয়া ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন কেউ কেউ। আবার কেউ বলেছেন—কাজের ত্রুটি থাকলে যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিভিন্ন দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টারা বিদায়ের বার্তা দেন। ১৮ মাসের দায়িত্বকাল শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হলেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিলুপ্ত হবে। এরপর তারা নিজ নিজ পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাবেন বলে জানান।
কার্যত শেষ কর্মদিবস
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত অফিস কার্যক্রম শুরু হবে। ফলে মঙ্গলবারকেই অনেকেই কার্যত শেষ কর্মদিবস হিসেবে ধরে নেন। সেই প্রেক্ষাপটেই উপদেষ্টারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিদায় বিনিময় করেন।
ইতোমধ্যে অনেকেই মন্ত্রণালয়ের কক্ষ থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী সরিয়ে নিয়েছেন। সরকারি বাসভবন ছেড়ে দিয়েছেন কেউ কেউ, বাকিরাও অচিরেই ছাড়বেন বলে জানিয়েছেন।
দায়িত্ব শেষে কে কোথায়?
উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্য জানিয়েছেন, ঢাকায় তার নিজস্ব বাসা নেই। দায়িত্ব শেষ হলে তিনি নিজ জেলা চট্টগ্রামে ফিরে যাবেন। আরেকজন জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবেন, যেখানে আগে কর্মরত ছিলেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই তিনি পেশাগত জীবনে ফিরবেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, কার্যত তাদের দায়িত্ব শেষ পর্যায়ে। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবেন।
ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন এবং সচিবালয়ের কক্ষ খালি করেছেন। আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেই সরকারি বাসভবন ছেড়ে চট্টগ্রামে ফিরে যাবেন।
পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব
জানা গেছে, প্রায় সব উপদেষ্টাই কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ সাধারণ (সবুজ) পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন এবং কয়েকজন তা ইতোমধ্যে পেয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টাসহ সবাই সম্পদের বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে সেগুলো প্রকাশ করা হয়।
‘বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩’ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পদাধিকারীদের জন্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। পদমেয়াদ শেষ হলে তা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অনিশ্চয়তায় দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত উপদেষ্টারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন—এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা নেই। এতে কেউ কেউ বিভ্রান্তিতে রয়েছেন।
তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েকজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত তার নির্দেশনা অনুযায়ী তারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, নতুন সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে উপদেষ্টারা কার্যত শেষ অফিস ধরে নিয়ে বিদায় নিয়েছেন।
সচিবালয়ে বেদনাময় আবহ
দীর্ঘ দেড় বছরের দায়িত্ব শেষে বিদায়ের দিনে সচিবালয়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। কেউ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কেউ ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। নতুন সরকারের আগমনের অপেক্ষায় এখন প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়।

আপনার মতামত লিখুন :