ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ১৯ দিনের টানা প্রচারণা শেষ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এখন অপেক্ষা ভোটের দিনের। দীর্ঘ আলোচনার পর আসন বণ্টন, জোট গঠন ও ভাঙনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সমীকরণ দাঁড়িয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের ফলে এবার বড় দলের প্রতীক ব্যবহারে কড়াকড়ি থাকায় দল ও প্রতীকের হিসাবেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
বড় দুই শিবিরের নেতৃত্বে নির্বাচনি লড়াই
নির্বাচনের মূল আলোচনায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে বিগত আওয়ামী লীগ ও তাদের ১৪ দলীয় জোট সরাসরি দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি ও দলটির একটি অংশ পৃথক প্ল্যাটফর্মে ভোটে রয়েছে।
এ ছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছে বামপন্থি দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’, সুফিবাদী দলগুলোর সমন্বয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ এবং জাতীয় পার্টির একটি অংশের নেতৃত্বে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)’। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শ, কৌশল ও আসন সমঝোতার হিসাব থেকেই জোট গঠিত হয়েছে। কোথাও সমঝোতা হয়েছে, কোথাও ভাঙনও দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচন ভিন্ন বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিএনপি জোট: ধানের শীষ ও শরিকদের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৯১ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। শুরুতে ২৯২ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়।
বিএনপির শরিক কয়েকটি দল নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে। এর মধ্যে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম রয়েছে। এছাড়া বিএনপির ছেড়ে দেওয়া একটি আসনে এনডিএম চেয়ারম্যানও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দল বিলুপ্ত বা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ
আরপিও’র বিধিনিষেধের কারণে অন্য দলের প্রতীক ব্যবহার না করে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন কয়েকজন নেতা। কেউ দল বিলুপ্ত করেছেন, কেউ পদত্যাগ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
বিএনপি জোট থেকে সরে যাওয়া দল
আসন সমঝোতা নিয়ে মতভেদে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে কয়েকটি দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি শেষ পর্যন্ত জোট ছাড়ে। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্য এককভাবে একাধিক আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট
জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনি মোর্চা ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ ২২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। শুরুতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ জোটে থাকলেও আসন সমঝোতা না হওয়ায় তারা সরে যায়। পরে বাংলাদেশ লেবার পার্টি যুক্ত হওয়ায় জোটের সংখ্যা আবার ১১-তে দাঁড়ায়।
জোটে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামী পার্টির একটি অংশ, এলডিপি, এবি পার্টি, জাগপাসহ আরও কয়েকটি দল।
এককভাবে নির্বাচন করছে যারা
জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি কোনো জোটে না গিয়ে ১৯৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরের দল) জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে ২৫৮টি আসনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)
জাতীয় পার্টির একটি অংশের নেতৃত্বে গঠিত ১৮ দলীয় জোট এনডিএফ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এতে রয়েছে জাতীয় পার্টির বিভক্ত অংশ, জেপি, তৃণমূল বিএনপি, গণফ্রন্ট, মুসলিম লীগসহ একাধিক ছোট দল।
বাম জোট: গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট
বাম ঘরানার ৯টি দল নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠিত হয়েছে। এতে রয়েছে সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, জাসদসহ আরও কয়েকটি সংগঠন। বাম ধারার ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
বৃহত্তর সুন্নি জোট
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি—এই তিনটি সুফিবাদী দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে জোটের সমীকরণ আগের চেয়ে ভিন্ন। বড় দলগুলোর নেতৃত্বে শক্তিশালী ব্লক থাকলেও ছোট দলগুলোর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করেছে প্রতীক ও আসন সমঝোতার ওপর। ভোটের মাঠে কে কতটা সুবিধা নিতে পারে, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিনেই।

আপনার মতামত লিখুন :