ঢাকা শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫৭ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটের দিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের অনেকেই এখনও গ্রেপ্তারের বাইরে থাকায় ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেকে বলছেন, আশঙ্কা থাকলেও তাঁরা কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

স্থানীয় সূত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলে অন্তত সাতটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের তৎপরতায় প্রায়ই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে, খুনের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। নির্বাচনকে সামনে রেখে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হলেও অধিকাংশ প্রভাবশালী অপরাধী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে ভয়মুক্ত পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকির অভিযোগও উঠেছে। ফলে ভোটের দিন পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর খুলনা আদালতের সামনের সড়কে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে দুই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এর আগে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান চরমপন্থি সংগঠনের দুই নেতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাঁদের মুক্তির পর থেকেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত এক বছরে জেলায় অর্ধশতাধিক হত্যাকাণ্ড ও বহু লাশ উদ্ধারের তথ্য সামনে এসেছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগরীতে কয়েকটি কিশোর গ্যাং ভেঙে একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে। পাশাপাশি দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চরমপন্থি বাহিনী সক্রিয়। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়া কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির পর এসব গ্রুপের তৎপরতা বেড়েছে। তাঁদের অনেককে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ সূত্র জানায়, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তলা এলাকায় চরমপন্থিদের তৎপরতা রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল যেমন কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা ও আশপাশের এলাকায় বনদস্যুদের প্রভাবও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। যদিও কিছু অস্ত্র উদ্ধার ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে এখনও অধরা।

নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গত ২৬ জানুয়ারি থেকে খুলনায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও মহড়া পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটারদের আস্থা ফেরাতে এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছয়টি সংসদীয় আসনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পৃথক সেল গঠন করা হয়েছে।

খুলনা-২ আসনের এক প্রার্থী বলেছেন, গত এক বছরে জেলায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উদ্বেগজনক। তিনি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান, কড়াকড়ি চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানান। তাঁর মতে, কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরবে না।

অন্যদিকে খুলনা-৫ আসনের এক প্রার্থীও চরমপন্থি তৎপরতা ও অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারবেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

খুলনা নাগরিক সমাজের এক প্রতিনিধি বলেন, এখনও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া জনমনে শঙ্কা বাড়িয়েছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং সব কেন্দ্রকে গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে এবং কেউ অস্ত্রের অপব্যবহার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

র‌্যাব জানায়, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, ককটেল ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে এবং আট জেলায় একাধিক টহল দল কাজ করছে। কোস্টগার্ডও উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন নজরদারি ও বিশেষ গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি এখনও ভোটারদের আস্থার কেন্দ্রে রয়েছে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Link copied!