বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসন পেয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি দলের নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় মেরুকরণের কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
১৮ থেকে ৬৮ আসনে উত্তরণ—এই উল্লম্ফন কি কেবল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতির ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত কৌশল, জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক আবহ এবং দীর্ঘদিনের ‘মজলুম’ বয়ান—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতের মধ্যেই সীমিত ছিল। ফলে বিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে সরে আসে বলে মনে করছেন অনেকে।
নির্বাচনী ইতিহাসের রূপান্তর
জামায়াতের নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ সালে তারা পেয়েছিল ১৮টি আসন (ভোট ১২.১৩ শতাংশ)। ১৯৯৬ সালে তা নেমে আসে ৩টিতে (৮.৬১ শতাংশ)। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ১৭টি আসন পেলেও ভোটের হার ছিল ৪.২৮ শতাংশ। ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসন। সেই পটভূমি থেকে এবারের এককভাবে ৬৮টি আসন জয় দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উত্থান।
বিশেষত ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে জোটগতভাবে ৭টিতে (জামায়াত ৬, এনসিপি ১) জয়কে রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংগঠন ও নীরব প্রস্তুতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাবেক অধ্যাপক ড. এম এ কাইয়ুমের মতে, দমন-পীড়ন ও নেতৃত্ব সংকটের মধ্যেও জামায়াত তাদের সাংগঠনিক কাঠামো অটুট রাখতে পেরেছে। নিয়মিত রুকন সম্মেলন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলভিত্তিক কার্যক্রম দলটির ভিত্তিকে মজবুত করেছে।
দলটির নারী সংগঠনের তৃণমূল প্রচারণা—যা অনেকেই ‘নিভৃত বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করছেন—গ্রাম থেকে শহরের আবাসিক এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
জুলাই-পরবর্তী প্রেক্ষাপট ও তরুণ ভোট
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জামায়াতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এর সক্রিয় ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাফল্য দলটিকে তরুণদের কাছে দৃশ্যমান করে তোলে।
জুলাই আন্দোলনের আবেগধারী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয়ও জামায়াতকে নতুন রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। তরুণ ভোটারদের একাংশ এটিকে ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফোর্স’ হিসেবে দেখেছেন।
গ্রাম থেকে শহর: বিস্তৃত প্রভাব
উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর) জামায়াতের শক্ত অবস্থানের পাশাপাশি ঢাকার একাধিক আসনে জয় দলটির নগরভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। বাজারদর, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে ভোটারদের একাংশ জামায়াতকে বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
১৯৭১ প্রসঙ্গ ও সমালোচনার প্রশ্ন
দলটির রাজনীতির সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে তরুণ ভোটারদের একাংশের কাছে এ ইস্যুর প্রভাব তুলনামূলক কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বর্তমান আমির শফিকুর রহমান ‘নতুন দিনের রাজনীতি’ ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা দিয়ে দলকে ভিন্ন ইমেজে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
তবে বুদ্ধিজীবী মহলে এখনো অতীতের দায়বদ্ধতা ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থশক্তির অভিযোগ
নির্বাচনকে ঘিরে অর্থশক্তির ব্যবহার ও ভোট প্রভাবিত করার অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে নগদ অর্থ জব্দের ঘটনা এবং প্রবাসী রেমিট্যান্স ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, আদর্শিক রাজনীতির দাবির সঙ্গে এই অভিযোগ সাংঘর্ষিক। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এখন আর প্রান্তিক শক্তি নয়; বরং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার সরাসরি দাবিদার হিসেবে টেকসই অবস্থান গড়তে হলে তাদের সংসদীয় ভূমিকা, নীতিগত অবস্থান এবং বহুত্ববাদী সমাজে গ্রহণযোগ্যতা—সবই বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।
১৮ থেকে ৬৮—এই উত্তরণ কি কেবল শূন্যস্থান পূরণ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্থানের সূচনা—তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।

আপনার মতামত লিখুন :