ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
বদলে যেতে পারে নির্বাচনি সমীকরণ

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে সংকটে জোট রাজনীতি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৩:২৬ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভেতরকার বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। সারা দেশে অন্তত ৭০টির বেশি আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দাঁড়ানো নেতারা শুধু বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের জন্য নয়, বরং জোট শরিকদের জন্যও অস্বস্তির পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিভাজন সরাসরি ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দাবি করছে, ভোটের আগে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সরে দাঁড়াবেন। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের একাংশের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৬ বছর রাজপথে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকার পর মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা নিজেদের প্রতি অবিচার অনুভব করছেন। তাদের বিশ্বাস, নির্বাচনে জয়ী হলে দল শেষ পর্যন্ত তাদের গ্রহণ করবেই।

২২ জানুয়ারির পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর তৃণমূলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভোট বিভক্তির শঙ্কা। একাধিক বিএনপি ঘরানার প্রার্থী মাঠে থাকায় দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক ছিন্নভিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এতে সুবিধা নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক জোট ও দলগুলো।

বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা ও সাংগঠনিক সংকট

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়। আইনি জটিলতায় শুরুতে তিনটি আসনে প্রার্থী বাদ পড়লেও আপিলে দুটি আসনে মনোনয়ন ফিরে আসে। বর্তমানে ২৯১টি আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনে রয়েছেন। তবে এর বিপরীতে অন্তত ৭২ জন নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপি ইতোমধ্যে ৭১ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু বহিষ্কারের পরও তারা মাঠ ছাড়েননি। বরং নিজ নিজ এলাকায় সংগঠন ও সমর্থকদের নিয়ে জোরালো প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঢাকায় বিদ্রোহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন। ঢাকা-১৪, ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন সাবেক ও বহিষ্কৃত নেতারা। এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সুযোগ নেওয়ার কৌশল নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির বিপরীতে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন দলটির বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক। ঢাকা-৭ আসনে সাবেক যুবদল নেতা ইসহাক সরকার এবং ঢাকা-১২ আসনে সাবেক যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এসব আসনে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

উত্তরবঙ্গ ও জেলা পর্যায়েও বিদ্রোহের ছায়া

নাটোর, রাজশাহী, রংপুর ও গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের একাধিক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় এসব নেতাদের নিজস্ব ভোটভিত্তি থাকায় নির্বাচনের ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা।

শরিকদের জন্য বাড়ছে অস্বস্তি

বিএনপি জোট শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আটটি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা শরিক প্রার্থীদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এছাড়া পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের বিপক্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। ঢাকার একটি আসনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

কী বলছেন প্রার্থী ও বিশ্লেষকরা

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশ তার সঙ্গে রয়েছে এবং নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও অনুকূলে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।

অন্যদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম শাওনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকার পর মনোনয়ন না পেয়ে তৃণমূলের চাপেই তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। তার মতে, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এসব নেতাকে নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে বিএনপিকে নির্বাচনে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

এখনো আশায় বিএনপি নেতৃত্ব

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা এখনও আশাবাদী। তাদের দাবি, শেষ মুহূর্তে আলোচনার মাধ্যমে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী সরে দাঁড়াবেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে—এই সংকট দ্রুত না মিটলে বিএনপি ও তার শরিকদের নির্বাচনি সমীকরণ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।

Link copied!