দেশব্যাপী চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের নির্দেশনার পর গত ১ মে থেকে পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সহস্রাধিক চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে মহানগর, জেলা ও থানা পর্যায়ে পুরোনো তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। সেই তালিকার ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। এবার তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান শুরু হওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক নজরদারি বাড়াতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পৃথকভাবে চাঁদাবাজদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের কঠোর নির্দেশনার পর ইউনিটভিত্তিক অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক তদবির গ্রহণ করা হবে না।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীজুড়ে ১ হাজার ২৫৪ জন চাঁদাবাজের তালিকা প্রস্তুত করেছে। থানাভিত্তিক এই তালিকা ধরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকাভুক্তদের অনেকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
র্যাবও সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। বাহিনীটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ১৫টি ব্যাটালিয়ন একযোগে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হচ্ছে।
তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মীদের গ্রেফতার করলেই পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। চাঁদাবাজির নেপথ্যের মূল পৃষ্ঠপোষক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে আইনের আওতায় আনতে না পারলে অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে অনেক সময় ছোট পর্যায়ের সদস্যরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে না। তাই টেকসই সমাধানের জন্য মূল পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণ মানুষকে চাঁদাবাজির শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দেওয়া বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :