ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

নতুন সরকারের সামনে শিক্ষাক্ষেত্রে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩৮ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কাঠামোগত সংস্কার—নতুন সরকারের সামনে শিক্ষাখাতে এমন একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা। তাঁদের মতে, শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা না গেলে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা হচ্ছে মানব সক্ষমতা বিনির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও কর্মমুখী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে—এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষাখাতে অরাজকতা ও নীতিগত অস্থিরতা বন্ধ করাই হবে প্রথম কাজ।

শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা

শিক্ষাবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অস্থিরতা ও ঘনঘন আন্দোলনের কারণে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানো এবং একাডেমিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজের অধ্যক্ষ ড. নজরুল ইসলাম খান বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানোও জরুরি।

মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

শিক্ষাবিদদের অভিমত, শিক্ষার গুণগত মান উদ্বেগজনকভাবে নেমে গেছে। আন্তর্জাতিক তো দূরের কথা, আঞ্চলিক মানদণ্ডেও অনেক প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে। রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, অন্তত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার মান দ্রুত উন্নত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মানোন্নয়ন না হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া যাবে না।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক কারিকুলাম পরিমার্জন, শিক্ষক নিয়োগ ও পেশাগত উন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত পুনর্বিবেচনা এবং কার্যকর পাঠঘণ্টা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা

অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসন—সব পক্ষকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান রাশেদা কে চৌধুরী। তাঁর মতে, ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে ধাপে ধাপে বিকেন্দ্রীকরণের পথে যেতে হবে।

কে এম এনামুল হক বলেন, বৈষম্য নিরসনে মেয়ে শিশু, প্রতিবন্ধী ও আদিবাসীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। শহর-গ্রামের ব্যবধান কমানো, বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাসও সময়ের দাবি।

বিনিয়োগ ও জবাবদিহি

শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তার স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কে এম এনামুল হক প্রস্তাব করেন, জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জোরদার করা প্রয়োজন।

দুর্নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার

নিয়োগ, ভর্তি, কোচিং ও গাইডবই বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম শিক্ষার অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে আছে বলে মন্তব্য করেন রাশেদা কে চৌধুরী। তাঁর মতে, দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভাজন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা দূর করার তাগিদ দেন তিনি। প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাবও আসে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে প্রবেশের পথ সুগম করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি পূরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে শিক্ষাখাতে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সম্ভাবনাও বিস্তৃত। শিক্ষাবিদদের মতে, সুশাসন, মানোন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারলে শিক্ষা খাতই হতে পারে দেশের টেকসই অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি।

Link copied!